Tuesday, June 10, 2014

জীবনের স্বাদ খোঁজা দম্পতির সাথে দুইদিন “জীবন”

 জীবন বলতে আপনি আর আমি কি বুঝি তার অর্থে এই দুই মানুষের জীবন ভিন্ন কিছুই হবে। কিন্তু আমাদের কাছে জীবনের অর্থ যাই হোক। ওরা জীবন উপভোগ করছে। তাদের সেই অধিকারও আছে। আমার আপনার অতিকৌতুহল যেন তাদের জীবনের ব্যাঘাত না ঘটায়।

২০১১ সালের এক সকালে ঢাকা থেকে উপকূল ট্রেনে রওনা দিলাম “জীবন” দেখতে যাব বলে। ট্রেন থেকে নেমে আমাদের জন্য নিধারিত সিএনজি চালিত টেম্পুতে চড় বসলাম। মিনিট ত্রিশ চলার পর টেম্পুটি একটি নদীর তীরে এসে দাড়াল। এবার যাতায়াতের মাধ্যম পরিবতন করতে হবে। আমরা ছোট একটি নৌকায় উঠে বসলাম। মাঝিসহ আমরা চারজন এত ছোট তিতাসকে দেখেছি আজ তার পুরোপুরি বিপরতী। বিশাল বিশাল ঢেউ। ছোট নৌকাটা যেন বার বারই উল্টে যেতে চায়। মাঝির দক্ষতার সাথে আমাদের একটা পরিত্যাক্ত ইটের ভাটায় নামিয়ে দিয়ে গেল। এটাই আমাদের প্রাথমিক গন্তব্য।

চারিদিকে নদী আর মাঝখানে ইটের ভাটা। কেমন যেন ভূতুরে পরিবেশ। আগামী দুইদিন এখানে থাকতে হবে। একটা অস্থায়ী ঘরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হল। নদীর জলে হাত মুখ ধুয়েই আলী ভাত ( স্থানীয় ভাবে সারা বছরে উৎপাদিত সকল শ্রেনীর শষ্যের বীজ দিয়ে রান্না ভাত)খেয়ে। কিছুক্ষণ হাটাহাটি করে ঘুমাতে গেলাম। দুপুরে ঘুম থেকে উঠার পর জানানো হল খাবারের জন্য আমাদের নদীর মাঝখানে যে সবুজ একটা চল দেখা যায় সেখানে যেতে হবে। ঐটাই তাদের আসল বসত ভিটা। আবারও সঙ্গী সেই ছোট নৌকা। ডুবুডুবু করে আমরা গন্তব্যে মিনিট দশেকের মধ্যে আমরা গ্রামে পৌছলাম। ছোট গ্রাম দশটি পরিবাররও হবে এই গ্রামের। বষায় নৌকা আর শুষ্ক মৌসুমে হাটা। এই দুই ছাড়া ঐ গ্রামের কোন যাতায়াত মাধ্যম নেই। আমাদের জন্য খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। পুঁইশাক, লেবু পাতা দিয়ে টাকি মাছ, চান্দা মাছ ভাজি, ছোট ছোট আলু ভাতি চিংড়ি শুটকি দিয়ে, মিষ্টি আলুর টক আর লাল বোরো চালের ভাত।

ভাত খেয়ে গ্রাম দেখার পালা। কয়েক লক্ষ বগ ফুটের মধ্যে সবার জীবন বাধা। চাইলেও যেন বেশি কিছু করা নেই। কিছু সময় হাটাহাটি করার পর আমরা অনুমতি চাইলাম রাতটা গ্রামে কাটানোর জন্য। আমাদের থাকার অনুমতি মিলল। সন্ধ্যা সতটার আগে ডাক পড়ল খাবারের জন্য। এত তাড়াতাড়ি খেতে পারব কি করে? লোকজন আটার মাঝে তারা ঘুমিয়ে পড়বে। কাল সকাল থেকে শুরু হবে কাজ। দশটা পযন্ত জেগে থেকে ঘুমাতে গেলাম। কোন ভাবেই ঘুম আসে না। গর্জনে নদী যেন সমুদ্রকে মাঝে মাঝে হার মানায়। এখানে নদীর ঢেউয়ে শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই।

ভোরের আলো আসার আগে আমাদের ডাক পড়ল। ক্যামেরা নিয়ে দুইজনই তাদের কাজ শুরু করল। আমার কোন কাজ নেই। আমি শুধু দেখছি একটা মেয়ে সারা দিনে কত কাজ করে। তারা পালা করে ছবি তুলছে প্রতিটি কাজের ছবি। সন্ধ্যার সাথে সাথে মনে হল মেয়েটা শতাধিক কাজ করে। রাতে খাবারের পর আমাদের সাথে এসে বসলেন তিনি। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মেধার সর্বোচ্চ পরিচয় দিয়ে এই গ্রামে এসে ভিত্তি গেড়েছেন তিনি। অথ একটাই “জীবন” তিনি জীবন উপভোগ করতে চান। আর তা প্রকৃতির সাথে মিলে মিশে। কিভাবে চলে এই জীবন সৌর বিদ্যুতের সাহায্যে আলোর কৃত্রিম ঝলক আসে সত্যি। কিন্তু তাছাড়া সকল কাজই সেরে ফেলি সূর্যের আলোয়। সপ্তাহে একদিন শহরে যাই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনতে। পড়াশোনার বই আনতে মাঝে মাঝে ঢাকায় যাই দুজনে, আর বেশির ভাগ বই আসে দেশের বাইরে থেকে ডাকে। অনলাইনে পড়াশোনার তেমন অভ্যাস না থাকায় তিনি সকল বই-ই প্রিন্ট দিয়ে পড়েন। বই গুলো নিজেই বাধাই করেন। পাশের গ্রামের সরকারী স্কুলে সপ্তাহে দুইদিন শিশুদের ইংরেজি আর গণিত পড়ান।

পরেদিন সকালে আমরা তার স্বামীর কাজ দেখেতে ব্যস্ত হলাম। সকাল থেকে তাকে অনুসরণ। তার সাথে বাজারে গেলাম। বেচারার অনুরুধ একটা কোনভাবেই যেন মানুষ বুঝতে না পারে বিশেষ ভাবে তার ছবি তোলা হচ্ছে। দুইজনই তার মতামতকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ছবি তোলে। ২০১১ সালের এই ছবি তোলার কাযক্রম ২০১৫ সাল পযন্ত চলবে। এই সময়ের মধ্যে তাহাদের কোন প্রকার ছবি, কিংবা গ্রামের ছবি প্রকাশে আমার নৈতিক বাধা হয়েছে। তবে অনুমতিক্রমে ততটুকু তথ্য প্রদানে বাধা নেই যা তাদের স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য অন্তরায় নয়।

২০১১ সাল এবং ২০১২ পযন্ত আমার মোট ৫বার তাদের সাথে দেখা হয়েছে। এবং


২০১২ শাহবাগে একদিন জিজ্ঞাসা করলাম কেন গণমাধ্যমে এড়িয়ে চলেন?
তিনি জানালেন, একবার একজন তার একজন সংবাদ প্রকাশ “ প্রেমের তরী ভিড়ল .....গ্রামে” শীষক সংবাদটিতে তাদের অনেক অসত্য ব্যক্তিগত তথ্য প্রদান করা হয়েছে। এবং কিছু সত্য তথ্য ও দেওয়া হয়েছে যা একান্ত ব্যক্তিগত। ঐ সংবাদের পর পর মানুষজন নিয়মিত তাদের গ্রামে যায় এবং তার সাথে ছবি তুলে। ক্লাস চলা সময় ক্লাসের ভিতর চলে যায়। তার স্বামী বাজারে গেলে বাজারে তার ছবি তুলে। ক্রমেই তারা চিড়িয়াখানার জন্তুতে পরিণত হয়ে যাচ্ছিল।

কেন শহরের জীবন বাদ দিয়ে এই জীবনের পথে?
জীবন মানে জীবন। জীবন মানে ভালবাসা। জীবন মানে প্রকৃতির কাছাকাছি বসবাস। আমার কাছে জীবন মানে প্রতি মূহুর্তে অন্য জীবনের সাথে ল্যাপটে চ্যাপটা হয়ে যাওয়া। এই সবই আমি পাই এই গ্রামে। তাই শহুরে জীবন কিংবা গ্রামীণ জীবন নয়। আমি জীবনের জন্য বাঁচার স্বাদ পেতে এই গ্রামের আছি। তাছাড়া আমার স্বামীর পূব পুরুষরা এই গ্রামে কাটিয়েছে তাদের জীবন।

কেমন উপভোগ করছেন জীবন?
খুব খারাপ নেই, আপনারা খাবার আর বিলাসীকতার জন্য দৌড় জাপ করছেন। আর আমরা এখানে তাই উপভোগ করছি। ‍শুধু পাথ্যক আপনার সব কিনে আনেন। আমরা এখানে উৎপাদন করি । আমাদের প্রতিটি খাবারে আমরা আমাদের শ্রমের গন্ধ পাই।


গ্রামের মানুষদের যেতে দিতে আপনাদের এত আপত্তি কেন?
আমার সকল কিছু আপনাকে জানাতে হবে তা তো কোথাও নিয়ম নেই। আপনারা গ্রামে আসুন আমাদের আপত্তি নেই। তবে কতজন আসতে পারবেন, কতজন আসবেন, কখন আসবেন, তা আমরা নির্ধারণ করব। আমাদের এই গ্রাম কোন ট্যুরিস্টদের জায়াগা নয়। তাছাড়া আপনি কি দিবেন আপনার গুলশান, ধানমন্ডি কিংবা বারিধারা বাড়িতে আমাদের অবাধ বিচরণ করতে। তাছাড়া কাউকে থাকার কোন প্রকার অনুমতি দেওয়া হবে না।

জার্মান ভাষায় একটি ব্লগ এবং বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় ব্লগে এই পরিবারটি সম্পর্কে লেখায় তাদের গ্রামে দশনাথীদের সংখ্যা বেড়ে যায়। যা তাদের স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় প্রভাব ফেলে। ফলাফল তারা সকল প্রকার গণমাধ্যম এবং অনাকাঙ্খিত ব্যক্তির উপস্থিতি এড়িয়ে চলেন। গ্রামটির নাম ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনে সভ্য মানুষদের অসভ্য আচরনের প্রভাবে স্বাভাবিক জীবন যাপনে সমস্যা হয় বিধায় গ্রামের নাম দেওয়া হয়নি।

Sunday, May 25, 2014

কৃষকের ছেলে সৌরভ,আমাদের গুগুল জ্ঞানী হাম্বা

হাম্বা। এটি হাম্বার ছবি।


মাস কয়েক আগে ঢাকার কাছের এক গ্রামে গিয়েছিলাম। এই গ্রামে আমার সাথে প্রথম হাম্বার পরিচয় হল। হাম্বা হল গরুর বাছুর মারা গেলে তার চামড়া সংরক্ষণ করে। খড়,বাঁশ, দড়ি দিয়ে বাছুরের আকৃতি তৈরি করা হয়।

কেন মৃত বাছুর কে এই ভাবে সংরক্ষণ করা হয়। এই প্রশ্নের উত্তরে উপস্থিত কয়েকজনের উত্তর ছিল হয়তবা গ্রামবাসী বর্বর, অজ্ঞ, কুসংস্কার ইত্যাদি। এই সকল প্রশ্নের সমাধান করতে এগিয়ে আসলেন গ্রামের কিশোর সৌরভ আর মুয়াজ্জিন সাহেব।

বাছুর মারা যাওয়ার পর বাছুর সংরক্ষণ করা হয় ববর্তা, অজ্ঞতা কিংবা কুসংস্কারের জন্য নয়। গাভীর দুধ নেওয়ার জন্য এই হাম্বাটির গায়ে লবন মাখিয়ে স্থানীয়রা গাভীর সামনে রাখে। গাভী হাম্বার গা চাটতে থাকে। ফলে তাদের দুধ সংগ্রহে সুবিধা হয় এবং অধিক পরিমান দুধ পাওয়া যায়।

গ্রামের কিশোর সৌরভ আর মুয়াজ্জিন সাহেবের এই যুক্তি আমাদের অনেকের কাছে বিশ্বাস যোগ্য নয়। অজপাড়া গায়ের কৃষকের ছেলে আর মুয়াজ্জিনের যুক্তি হাম্বা গাভীর দুধ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে । তা জ্ঞানীদের মেনে নেওয়াটা কঠিন। সারা রাস্তায় চলছে যুক্তি তর্ক। কি কারণে গ্রামে বিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষার প্রসার দরকার। কুসংস্কার মুক্ত ও উন্নত কৃষির জন্য গ্রামের মানুষদের আরো উন্নত শিক্ষা দেওয়া দরকার।

অস্টেলিয়ার গবেষকরা দাবী করেছেন, গাভীকে গান শুনালে গাভী দুধ বেশি দেয়? সাদা চামড়ার এই গবেষকদের দাবীর বিপক্ষে কারো কোন বিতর্ক নেই। বেশির ভাগের উত্তর হুম হতেই পারে। বিষয়টা মনস্তাত্ত্বিক, গাভী মনে হয়তোবা প্রশান্তি আনে। তাই তার উৎপাদন বাড়ে।

হুম ভাই-ব্রাদার তর্কের জন্য শুধু আপনাদের জানাতে চাই। বিলাতের গরুর যদি গানে মনে প্রশান্তি মেলে তাহলে আমাদের দেশীয় গরুর কেন নিজের বাচ্চার দেহ চেটে শান্তি মিলবে না?আর কেনইবা সেই শান্তি গাভীর দুধ উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা নিবে না?

যদি কারণ হয়ে থাকে কিংবা মনে করে থাকেন যে আপনার জ্ঞানের খনি গুগুল কিংবা স্মার্টফোন ব্যবহারের সুযোগ কৃষকের ছেলে সৌরভের কাছে কিংবা মুয়াজ্জিনের কাছে নেই। এটা তাদের অযোগ্যতা। এই কারণে তাদের কথার কোন যুক্তি নেই। তবে শ্রদ্ধার সাথে জানাই,

জনাব গুগুল নির্ভর জ্ঞানী বন্ধুরা,
আপনাদের গুগুলের যে তথ্য কিংবা জ্ঞান তার জোগানদাতা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি কৃষকের ছেলে সৌরভ আর প্রকৃতির কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে সমৃদ্ধ মুয়াজ্জিনরাই।

আপনাদের আছে গুগুল আর তাদের আছে প্রকৃতি। আপনার গুগুল থেকে তথ্য নেন আর তারা তথ্যের যোগানদাতা। আপনি আমাকে প্রায়ই গুগুল ভুল তথ্য সরবারহ করে । কিন্তু প্রকৃতি থেকে শিক্ষা নেওয়া সৌরভদের শিক্ষাটা অনেক বেশি সরস। 

Saturday, April 12, 2014

শহরটা আমার এবং আমাদের। আসুন অক্সিজেনের কারখানা বানাই।

এই শহর নিয়ে হাজার অভিযোগ। হাজার সীমাবদ্ধতা। শহরে নিজের জমি নেই। আমার বাবারও জমি নেই। কিন্তু যে অক্সিজেন পাই তা আমার কিংবা বাবার লাগানো গাছের নয়। গত প্রায় ১যুগের বেশি সময় এই শহরে আছি । কয়েক হাজার টন অক্সিজেন গ্রহণ করেছি। এক টাকাও দেইনি।

এবার আমারও দায় শোধ করার প্রয়োজন। পুরো শহরটাই আমার। তাই আমার শহরে মাটি পেলেই গাছ লাগাই। অক্সিজেনের কারখানা বানাই।

Thursday, March 13, 2014

বিটি বেগুন বিজ্ঞানীদের বিশ্বাসঘাতকতা

বিটি বেগুন নিয়ে অনেক বৈজ্ঞানিক তর্ক আছে। এই তর্ক বৈজ্ঞানিক তর্ক নয়। যাদের সাথে তর্ক তারা তো বিজ্ঞান অনুসরন করেনি। করেছে একটি বিশেষজ্ঞান সেই জ্ঞান নিয়ে এই লেখা। বিস্তারিত পেতে ইনবক্স বাধ্যতামূলক..........................

বিটি বেগুন নিয়ে অনেক তর্ক আছে। বেগুনের সাথে বিশেষ জ্ঞানের সমন্বয়ের নামে বাংলাদেশে যা করা হয়েছে তাকে কোনভাবেই বিজ্ঞান বলা যায় না। যদিও বলা হয় বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা যে জাত তৈরি করেছেন কিন্তু তাতে আমাদের গর্বের কিছু নেই। বরং আছে জাতি হিসেবে ব্যক্তির স্বার্থে রাষ্ট্রের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার অতীতের ইতিহাস পুনরাবৃত্তি মাত্র। বারি যাই বলুক না কেন এটা তাদের গবেষণার ফসল। কিন্তু ইতিহাস ভিন্ন । একটি অসচ্ছ প্রক্রিয়া আর অসংখ্য গোজামিল দিয়ে আর যাই হোক বিজ্ঞান হতে পারে না। 

বারির দাবী এই বেগুনটি খাদ্য হিসেবে নিরাপদ। কিন্তু মজার বিষয় হল তারা কিসের তথ্যের ভিত্তিতে এই দাবী করেছে??
তারা তো তাদের নতুন এই বিটি বেগুনের নিরাপদ কিনা তার কোন প্রকার পরীক্ষাই করেনি।
তাহলে তারা কি করে বুঝল এটি নিরাপদ????
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা বারির নেই।
যদিও বারি বলবে পুষ্টিগুণ পরীক্ষা করা হয়েছে। পুষ্টি আর নিরাপদ দুইটি দুই জিনিস। আর তর্কটা কোনভাবেই পুষ্টিগুণ নিয়ে নয়।

বারি যে গোজামিল দিয়েছে তার প্রমাণ খুবই স্পষ্ট। যেমন বারি সাথে চুক্তি হয় এই বেগুন বিষয়ক ২০০৫ সালে কিন্তু মজার বিষয় হল বারি যেসব নিরাপদ বেগুন বলে দাবীর ভিত্তিতে তথ্য উপস্থাপন করেছেন তার বেশিভার তথ্যই ২০০৪ এবং ২০০৫ সালের তখন তো বারি কাজই শুরুই করেনি??? তাহলে বিটি বেগুণ (ফসল) পেল কি করে???
তারা চারটি ভিন্ন জাতের বেগুনের রিপোর্ট ঢুকিয়ে দিয়েছে। যা আমাদের দেশের কিংবা বারি’র দাবীকৃত বিটি বেগুণই নয়। যদিও বারি’র আন-অফিসিয়াল দাবী এটি খুবই ব্যয়বহুল তাই পরীক্ষা করা হয়নি?

তাছাড়া বারি যে চুক্তি করেছে অন্য দুইটি প্রতিষ্ঠানের সাথে তাতে দেশের স্বার্থ কিভাবে বিক্রিয়ে দেওয়া হয়েছে তা দেখে সুস্পষ্ট ভাবেই বুঝা যায়। সেখানে দেশের কিংবা বারি’র স্বার্থ কোনভাবেই রক্ষা হয়নি। যদিও গণমাধ্যমে বারি’র দাবী মালিকানা আমাদের কিন্তু আমি চুক্তি সুস্পষ্টভাবে দেখেছি তা ঐ বিশেষ কোম্পানীর বলে লেখা আছে।

এই কথা সত্য যে এই পুরো প্রক্রিয়াটি বিশেষ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তাই সকল প্রক্রিয়া শেষে বলা যায়। বিটি বেগুণ যতটা না গর্বের তারচেয়ে বেশি লজ্জার। বারি একটি আন্তজার্তিক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান এই বিটি বেগুণ নামের গোজামিল কর্মের জন্য। আমাদের জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, প্রতিবেশ, অর্থনীতি সবই হুমকির মুখে।
আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্টানগুলো পৃষ্ঠপোষক আমাদের জনগণ। এই জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে। যারা সরকারকে ভ্রান্ত তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করেছে কিংবা করছে তাদের কে বিচারের আওতায় আনতে হবে। তারা আমাদের আস্থা বিশ্বাসের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।

Monday, October 7, 2013

যে গ্রামে কখনো ঈদ আসে না।

ফলিয়ামারী ময়মনসিংহের চরাঞ্চলের একটি গ্রাম। ২৪ পরিবারের এই গ্রামের মানুষ প্রতিনিয়ত লড়াই করছে দরিদ্রতার সাথে। আমাদের শহরে ঈদ যখন রঙ্গিন হয়ে ওঠে প্রতিটি মানুষের জীবন। তখন ঐ মানুষগুলোর জীবনে ঈদ মানে আর অন্য আট-দশটা দিনের মতই অভাবের সাথে লড়াই। গত ২০ বছরে এই গ্রামে কোরবানীর ঈদে কোন কোরবানী হয়নি। ২০ বছর আগে পাশের গ্রামের সমাজের সাথে ছিল তাদের সমাজ, ঐ সমাজের দারিদ্রতার জন্যই তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে দিযেছে। কোরবানীর ঈদের মাংস তাদের কাছে এখন স্বপ্নের মত গল্প।

শুধু যে পাশের গ্রামের মানুষ তাদের বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে তা নয়। গোটা দেশটাই তাদের বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। সারাদেশে লক্ষ লক্ষ পশু কোরবানী হয়। কিন্তু একট টুকরো মাংস সেই গ্রামে পৌছে না। আমরা রাজধানী লোকেরা একাধিক পশু কোরবানী দেই। সেই কোরবানীতে কি এক টুকরো মাংস পৌছতে পারে না ফলিয়ামারী গ্রামের মানুষের জন্য? আমরা কি পারিনা ঐ সকল গ্রামের মানুষের জন্য কোরবানীর ঈদে কিছু করতে?

 কি পারি, কি পারি না তা নয়। এবার ঈদে মানুষগুলোর জন্য আমরা গত ২০ বছরের ঈদের স্মৃতি ভুলিয়ে দিতে চাই। Ibnul Syed Rana ভাই উদ্যোগ নিযেছেন। এই সপ্তাহে ঐ গ্রামে যাবেন। ২৪ পরিবারের শিশুদের ঈদ রঙ্গিন করতে যা লাগবে। তাই হবে ফলিয়ামারীতে এবার। আসুন ফলিয়ামারীর মানুষগুলোর সাথে আমরা আমাদের ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেই।

যারা যারা আমাদের সাথে যেতে আগ্রহী কিংবা অংশগ্রহন করতে চান যোগাযোগ করুন।

Wednesday, May 23, 2012

সীমার স্বপ্ন বাঁচাতে একটা স্কুল চাই.....

সীমার সঙ্গে এখনও আমার পরিচয় হয়নি। তবু গত কয়েকটা দিনে আমি, আমার পরিবার ও বন্ধুদের কাছে সীমা খুব পরিচিত। প্রতিদিন সবাই উৎকন্ঠা থাকে। অপেক্ষায় করে। সীমার জন্য একটা স্কুল পাওয়া গেল কি? এই প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষা। পাওয়া যাবে তো, তার উৎকন্ঠা। কিন্তু ১১ দিনেও এর একটির জবাব মেলেনি।


নুসরাত,কলি, পাপিয়া,ঝিলিক, রিমন,তুষার,নাদিম,সুমি, জাকিরসহ ২১জন মিলে অর্ধশত স্কুল খুঁজে ফেলেছি। লক্ষ টাকা গুরু দক্ষিণা নেওয়া স্কুল থেকে শুরু করে মাগানার প্রাইমারি স্কুল যেখানেই হোক সীমার জন্য একটি আসন। ‘ডানে বায়ে ঘুরে বেড়াই, মেলান যদি প্রভু।’ কিন্তু ধানমন্ডি, ঝিগাতলা, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, রায়ের বাজার কোথাও সীমার জন্য স্কুল নেই। অন্ধ, মূক, বধির, সুস্থ, সাদা-কালো, মেধাবি-মেধাহীন, মনযোগী-অমনোযোগী, বিত্তবান-বিত্তহীন সব শিশুর জন্য স্কুল আছে এই শহরে। আছে নাচের, গানের, আাঁকার আর কত রকম স্কুল। শুধু একটা স্কুল নেই সীমার জন্য।

কত স্কুলে যে আমার গেলাম! যখন বলি একটা বাচ্চা ভর্তি করব। অনেকেই রাজি হয়। কিন্তু সীমার ছবিটা দেখে পরক্ষণেই বলে না ভর্তি সম্ভব নয়। কেউ কেউ বিনয়ের সঙ্গে বলে “ আসলে হয়ে কী! বছরে মাঝামাঝি আমরা ভর্তি করি না।” আবার কেউ সহানুভ’তি দেখিয়ে বলে “গ্রাম মেয়ে! বুঝেনই তো এখানে প্রতিযোগীতায় পারবে না।” যাদের বিষয়িক বুদ্ধি ভালো, তারা বলেন “আরে ভাই! এত টাকা খরচ করে পড়িয়ে লাভ কি বলুন তো?” আরেকজন আরো এককাঠি সরেস। যে কিনা স্কুলের মালিক। তার ভান্ডারে আছে ডজনখানিক দেশ দেখার অভিজ্ঞতা। তিনি পরামর্শ দিলেন, সীমার জন্য একটা স্কুল খুলে ফেলবার। আশ্বাস দিতেও কার্পন্য করেননি। বলেছেন, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবেন। স্কুল খোলা পরই আমরা বুঝব কেন সীমাকে ভর্তি করা হয়নি। সীমার জন্য স্কুল না পেলেও বিনামুল্যে এমন হাজারও উপদেশ পাচ্ছি।


এখন সীমার কথা বলি। স্কুলে কাশ টুতে পড়ে। বয়স মাত্র নয়। চোখ বন্ধ করলেও, ভেসে ওঠে লাল টুকেটুকে জামা পড়া একটি দুরন্ত শিশুর মুখচ্ছবি। বুদ্ধিদীপ্ত, দুষ্টুমিভরা এক জোড়া চোখ। কিন্তু আমাদের সীমা এমন নয়। হয়ত এমনই হওয়া কথা ছিল। কিন্তু ওর বয়স যখন নয়, তখন তার পাষন্ড বাবা ও চাচা এসিড ঢেলে সীমা ও তার মায়ের মুখ জ্বলসে দেয়। ওর সুশ্রী চেহারার লাবন্যটুকু কেড়ে নিয়েছে এসিড। এরপর পদ্মায় মেঘনায় অনেক জল গড়িয়েছে। মাতৃক্রোড় হারিয়ে, সীমা এখন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুলের আবসিক ছাত্রী।


সীমার মা মীরা। সংসার হারিয়েছেন অনেককাল আগেই। নিজেও এসিডদগ্ধ। সব মেনে নিয়েছেন। শুধু এখন একটিই চাওয়া। নিজের মেয়েকে নিজের কাছে রাখতে চান। এই আকুতিই তার কন্ঠে। বলেন, “ইদানিং ঘুমের মাঝে মেয়েটাকে বেশি বেশি স্বপ্নে দেখি। মাঝ রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে সারা রাত আর ঘুম আসে না। আমি জানি আর আমার আল্লাহ জানে কেমন লাগে। মনে হয় মেয়েটার কাছে ছুটে যাই রাতেই। প্রায়ই ভাবি মেয়েটাকে ঢাকায় নিয়ে আসব। কিন্তু এই শহরে তো কোন স্কুলে সীমারে স্কুলে ভর্তি করব না”।


আমার প্রবাসী বন্ধু এটম রহমান নিজের মাকে দেশে ফেলে হাজার মাইল দুরে থাকেন। তাই সীমার ও তার মায়ের কষ্টটা খুব করে বুঝেন তিনি। এই কষ্টের অবসান করতে চান। তাই নিজেই উদ্যোগ নিয়ে স্কুল খুজে বের করে সীমাকে ঢাকায় নিয়ে আসতে চান। সেই অনুযায়ী চেষ্টাও করছেন। সীমার মায়ের জন্য ঢাকায়  বাসস্থান ও কর্মসংস্থান দুই-ই খুব কঠিন নয়। কিন্তু সব উদ্যোগ আটকে গেছে, কেন না সীমার জন্য দুই কোটি মানুষের রাজধানীর কোন স্কুলেই একটি আসন নেই। অনেক চেষ্টা করেও পাওয়া যায় না। প্রতিবন্ধী স্কুল হয়ত সীমাকে ভর্তি করাবে। কিন্তু একটাই প্রশ্ন একজন স্বাভাবিক বুদ্ধির শিশুকে কেন ভর্তি হতে হবে বিশেষ শিশুদের স্কুলে?


সবাই মিলে রোজই স্কুল খুঁজি। ভাবি হয়ত পরের স্কুলেই একটা আসন হয়ে যাবে সীমার জন্য। অষ্ট্রেলিয়ায় ফোন করে, এটম ভাইকে বলতে পারব “ভাই...! স্কুলটা আমি পেয়ে গেছি সত্যি। এখন আর কেউ আটকাতে পারবে না।” আমি জানি এটম ভাইও এই কথা শুনতে অধীর অপেক্ষায় আছেন।তার বিশ্বাস আমরা আমরা সীমা পূরনে একটা স্কুল খুঁজে পাবই। এই বিশ্বাস নিয়ে আমাদেরও সকাল শুরু হয়। আমরা স্কুল খুঁজি। আজও খুঁজব।


এই শহরে সভা সেমিনারে আমিও চিৎকার করেছি বহুবার বলেছি অধিকার! অধিকার! শতবার পড়েছি পাঠ বই, পত্র-পত্রিকাতে। সভা সেমিনার, ভাষণে শ্লোগানে কতবার শিক্ষাকে দেখেছি অধিকারের মোড়কে। আমার  সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৭এ একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা দানের কথা বলা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ১৯ (১) সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতার নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছে।


প্রাথমিক শিক্ষা (বাধ্যতামূলক করণ) আইন, ১৯৯০. ( ১৯৯০ সনের ২৭ নং আইন ). [১৩ ফেব্রুয়ারী,, ১৯৯০]. প্রাথমিক শিা বাধ্যতামূলক করণকল্পে প্রণীত আইন৷. যেহেতু প্রাথমিক শিক্ষা      বাধ্যতামূলক করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়;. সেহেতু এতদ্বারা নিম্নরূপ আইন করা হইল :-. সংপ্তি শিরোনামা. ১৷ এই আইন প্রাথমিক শিা (বাধ্যতামূলক করণ) আইন, ১৯৯০ নামে অভিহিত ...


বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৩ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ ও ১৯৮১ সালে প্রাথমিক শিা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৯০ সালে জাতীয় সংসদ কর্তৃক প্রাথমিক শিা (বাধ্যতামূলককরণ) আইন পাস করে।



এদেশের সংবিধান,আইনে সুস্পষ্ট করে না ছলে শত শত বার লিখা আছে সীমার অধিকারের কথা। কিন্তু আজ কোন আইন, অধিকারই সীমার জন্য স্কুলের সন্ধান দিতে পারছেনা। তারপরও আমাদের স্কুল খোজার দলটা ক্রমেই বড় হচ্ছে। এক সময় হাজার ব্যস্ততার মাঝেও বিদেশ থেকেই নানাভাবে এটম রহমান একাই সীমার জন্য যে স্কুলটা খোঁজ বেড়িয়েছেন। আজ সেই দলে অনেক বড়। প্রতিদিনই একজন না একজন যুক্ত হয় কাল রাতে এসে যুক্ত হয়েছেন ইটিভির সাঈদ মুন্না, সমকালের আমার বন্ধু রাজিব আহাম্মদ। দলটা এখন প্রায় ত্রিশ ছুঁয়েছে। আমরা সীমার স্বপ্নপূরনে একটা স্কুল খুঁজে বের করার স্বপ্ন দেখি। এই নগরে একটা স্কুল খুঁজে পেতেই হবে।


আমার একবন্ধু (বড় আপা) ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করছেন দুই বছর ধরে। গত মাসে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছে। স্কুল খোঁজা, অফিস, আড্ডা দরকারি ও অদরকারি শত কাজের মাঝেও দিনে অন্তত একবার তাকে দেখতে যেতে হয়। মানুষটা মৃত্যূর জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করছেন। আপার মোবাইল ফোন থেকে কল আসলে আমি রিসিভ করি না। প্রায় ভয় হয়। আপাও ঘটনাটা বুঝে ফেলেছেন। তাই উনি আমাকে এখন ফোন না দিয়ে এসএমএস করেন। শোভন স্কুল কি পেলি? গত এগারোদিনে ১৮টি এসএমএস দিলেন। একই শব্দ, একই বাক্য কাট এন্ড পেস্ট । শোভন স্কুল কি পেলি? কিন্তু এই প্রশ্নের জবাব যাদের কাছে আছে, তারা আমাকে দেয় না। তাই আমিও আপাকে রিপ্লাই দিতে পারি না।


আমরা বিশ্বাস করি ইট-পাথরের এই শহরের সবগুলো মানুষের হৃদয় এখনও পাথর হয়ে যায়নি। এই হাজারো সীমাবদ্ধতার মাঝেও আমরা একটা স্কুল পাব। কারো দয়া কিংবা করুনায় নয়। সীমা তার সাংবিধানিক অধিকার, মানবিক অধিকার বলে মাথা উচুঁ করে স্কুলে যাবে। সীমার পরশে আমাদের সমাজ প্রতিবন্ধী মানসিকতা থেকে মুক্তি পাবে।


বি :দ্র : সীমা এবং মীরাকে (সীমার মা) এসিড নিক্ষেপের অপরাধে নিম্ন আদালত যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত মানুষগুলো উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে ভাল আছে।

Monday, March 21, 2011

বাবা অসম্ভব মনে পড়ে, প্রচন্ড মনে পড়ে তোমাকে। যতই রাত হোক, ভোর হোক, দেরি হোক, তুমি আসো বাবা।

এটা সময় ছিল ঈদ মানে আমার বাবার জন্য অপেক্ষা করা। সব বন্ধুদের মাঝে আমার বাবাই ঢাকা থাকতেন। পুরো পরিবার আমরা অপেক্ষায় থাকতাম বাবা আসবে।
বাবা বাড়িতে আসার উপর নির্ভর করত আমাদের ঈদ আর ঈদের নতুন কাপড়। আর তাই বাবার বাড়িতে আসাটাই ছিল আমাদের ঈদ।র্

প্রতিবারই বাবা বড্ড দেরি করে আসতেন। কখনো আসতেন গভীর রাতে, কখনো ঈদের দিন ভোরে। এমনও হয়েছে সারারাত অপেক্ষা করে আমি নতুন কাপড়ের জন্য কান্নাকাটি করে ঘুমিয়ে পড়েছি। কোন উপায় না দেখে রাতেই মা গত ঈদের পাঞ্জাবি ইস্ত্রি করে রেখেছেন। যেন সকালে ঐ পাঞ্জাবি পড়ে নামাজ পড়তে যেতে পারি।

বাসা থেকে কয়েকশ গজ দূরে আমার স্কুল ছিল। স্কুলের তিনতলার ছাদ থেকে রেলগাড়ির আসা যাওয়া দেখা যেত। আমার ছাদের ওঠা নিয়ে ভয়ানক ভয় কাজ করত।
আমি কখনেই ছাদে ওঠতাম না। কিন্তু ঈদের দুই তিন আগ থেকে প্রতিদিন আমি বিকেলে আমার সকল ভয়কে জয় করে ছাদে উঠতাম আর রেল গাড়ি দেখতাম।

গোধূলি নামের একটা ট্রেন ছিল। ঠিক গোধূলি বেলায় ট্রেনটা আমার শহরে এসে থামতো। ঐ ট্রেনটা ঘিরে শুধু আমার না । পুরো এলাকার অনেকেরই উৎকন্ঠা থাকত।
ঢাকা থেকে ঈদের কয়েকদিন আগ থেকে প্রতিদিনই কেউ না কেউ আসত ঐ ট্রেনটা চেপে। ট্রেনটা আসলে আমরা সবাই ছাদ থেকে নেমে বড় রাস্তায় গিয়ে অপেক্ষা করতাম ঢাকা থেকে আসা অতিথিদের জন্য।

অতিথিদের রিকসার পিছনে পিছনে একেবারে বাড়ি পযন্ত পৌছে দিয়ে আসতাম। আমার বাবার কখনো ঈদের আগে ঐ ট্রেনে এসেছিলেন বলে মনে করতে পারছি না। কিন্তু আমি প্রতিবারই অন্যবন্ধুদের সাথে বড় রাস্তায় অপেক্ষা করেছি বাবার জন্য।

বাবা হয়ত বড্ড ব্যস্ত ছিলেন কিংবা এত বড় একটা সংসারের প্রয়োজনীয় ঈদের সকল সামগ্রীসহ আসাটা তার কঠিন হয়ে পড়ত।
বাবার সেই কষ্ট, সামর্থ্য বুঝার কখনোই চেষ্টা করিনি ।

বরং বড্ড রাগ হত বাবার উপর। কত প্রশ্নই না করেছি মাকে। সারাদেশের মানুষ ঈদে বাড়িতে আসে আমার বাবার কি কাজ? কত কাজ? কিসের এত ব্যস্ততা তার?

এমনও ঈদ এসেছে জীবনে সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, বাবা আমার জন্য নতুন প্যান্ট আর শার্ট নিয়ে হাজির।

গতরাতে জমানো হাজারো রাগ, অভিমান, অভিযোগ, কান্না ভুলে পকেটে বাবার দেওয়া নতুন চকচকে টাকা নিয়ে। বাবার হাত ধরে গিয়েছি নামাজ পড়তে। আসার সময় রঙ্গিন বেলুন হাতে বাড়ি ফিরেছি।

এখনো শহরে গোধূলিবেলায় গোধূলি নামের ট্রেনটা এসে থামে, সময়ের আগে জোড়ায় জোড়ায় নতুন কাপড় আসে আমার জন্য। কাপড়ের জন্য আমার আর অপেক্ষা করতে হয় না। শুধু অপেক্ষা আমার বাবার জন্য, আমার বাবা আসে না।

১৫টি ঈদ পার করলাম বাবাকে ছাড়া। ১৬ তম ঈদের প্রস্তুতি চলেছে।

চারিদিকে নতুন কাপড়, চকচকে টাকা, রঙ্গিন বেলুনের সুবাস, গরু-খাসি কেনার প্রস্তুতি। এই সকল প্রস্তুতির মাঝে বিশাল শূণ্যতা বাবাকে নিয়ে।

বাবা অসম্ভব মনে পড়ে, প্রচন্ড মনে পড়ে বাবা তোমাকে।
যতই রাত হোক, ভোর হোক, দেরি হোক, তুমি আসো বাবা।
আবারও আমাদের ঈদ হয়ে, আমার ঈদ হয়ে আসো তুমি।