কোটি মানুষের ঢাকা নিয়ে মেয়রদের হাজার কোটি টাকার পরিকল্পনা। যাদের টাকা
নেই তারা কি করবে ঢাকা নিয়ে। শহরটা তো তাদেরও। মেয়র/কমিশনার না হয়ে কোটি
টাকা ছাড়া কি ঢাকার জন্য কিছু করা যায় ?
আমি এক পাগলের কাজ দেখলাম
কাঠাল বাগান এলাকায়। সড়ক বিভাজনে সে ঘৃতকুমারী, ইক্ষু/গেন্ডারী/আখ আর লাল
শাক বুনেছেন। আপনার বাড়ি কিংবা অফিসের সামনের সড়ক বিভাজনে আপনিও লাগাতে
পারে বিভিন্ন গাছ।
গালাগালি তো অনেক করি। কিন্তু আপনি চাইলেই ঢাকা সবুজ হবে। আপনার একটা গাছই
ঢাকার সবুজের ঘনত্ব বৃদ্ধি করবে। আপনার বিশুদ্ধ অক্সিজেনের যোগানদাতা হবে।
ঢাকার বাতাস পরিচ্ছন্ন করবে। সামনেই বর্ষাকাল গাছ লাগানোর উপযুক্ত সময়।
আসুন একটা গাছ লাগাই।
শহুরে যান্ত্রিক জীবন প্রায়ই বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়ি। সত্য বলতে প্রতি মুহূতেই সুযোগ খুঁজি শহর থেকে পালাতে। কিছু করতে চাই । তাই ইচ্ছার বিরুদ্ধে রোবোটিক জীবন যাপন করতে হয় এ শহরে । জীবনের শুরুটা আমার ছোট এক শহরে। প্রাণবন্ত শহর ছেড়ে নিতান্ত বাধ্য হয়েই এই শহুরে জীবনের স্বাদ নিতে আসি। সত্যিই আবার ফিরে যাব আমার শহরে। আমি গুছিয়ে আমার ক্লান্তির কথা কাউকে বলতে পারি না, বলতে পারি না আমার স্বপ্ন কিংবা হতাশার কথা। তারপরও চেষ্টা করলাম " এই যান্ত্রিক শহর থেকে নিজেকে মুক্তির দেওয়ার পথটা জানানোর।
Wednesday, April 22, 2015
Monday, April 13, 2015
বৈশাখ মানে ইয়ুজু তোমার কাছে ক্ষমাপ্রাথী ।
২০০৭/০৮ সালের দিকে আমি টাঙ্গাইলের এক শাড়ী হাট থেকে একটি শাড়ী কিনলাম। আমার অসম্ভব রূপবতী বন্ধু ইয়ুজুর জন্য। শাড়ী কিনে তাকে জানালাম তোমার জন্য বিশেষ উপহার আছে। পহেলা বৈশাখের দিন দুয়েক আগে তার অফিসের কাজে বাংলাদেশে এসে হাজির।
আমাদের এখানে ছুটি থাকায় আমি ফোন বন্ধ করে বিশেষ ঘুম দিয়েছি। আমার বাসার লোকজন যেখানে যেখানে খুজেঁ পাওয়া যায় সবখানে খোজ নিল। আমি নেই।
ইয়ুজুকে জানানো হল আমাকে খুজে পাওয়া যাচ্ছে না।
অবশেষে একদিন পর। আমার বন্ধুর কল্যানে শেষ বিকেলে শাড়ী নিয়ে আমি ইয়ুজুর হোটেলে হাজির হলাম। সে আমাকে বলল তাকে শাড়ি পড়িয়ে দিতে। কিন্তু শুধু শাড়ি তো পড়া যায় না । সাথে আরো কিছু লাগবে। আমি ১ ঘন্টার মধ্যে ফিরব বলে, কি কি লাগবে তা আনতে গিয়ে পড়লাম সমস্যায়। ব্লাউজের সাইজ কি, পেটিকোটের রং কি হবে। সাথে শাড়ি আছে কিনা। তাহলে তারা মিলিয়ে দিবে।
রাত ৯টায় আমি বোনকে বললাম কোনভাবে সম্ভব হচ্ছে না। তুমি উদ্ধার কর। সে শাড়ি পড়ানো এবং ব্লাউজ,পেটিকোট কেনার দায়িত্ব নিয়ে আমাকে উদ্ধার করল।
রাতে যখন ফিরলাম ততক্ষনে ইয়ুজু ঘুম।
ঘুমানোর আগে সে ছোট চিঠি লিখে গিয়েছে কাউন্টারে। অনুরোধ করল আমি যেন হোটেলে থাকি। তা না হলে আবারও হারানোর সম্ভবনা আছে। থাকার ভাড়া সে দিবে। হোটেল কতৃপক্ষ জানিয়ে দিল কোন সিট ফাঁকা নেই। ম্যানেজার জাহাঙ্গীর সাহেবের বিশেষ ব্যবস্থাপনায় হোটেলে আমার ঘুমানোর ব্যবস্থা করা হল।
আমি আমার জন্য আনা বিশেষ ধরনের রেডিও শুনি । সাথে সাদা সাদা ডিম ফল খাচ্ছি। রেডিওতে কিছু শোনা যায না। শুধু ভু ভু আওয়াজ হয়। ভয়ানক রাত কোনভাব্ শেষ হয় না। এত নরম বিছানায় কি করে ঘুম হয়।
মহান ঘুম যখন আসি আসি, সূয উঠার সাথে সাথে ইয়ুজু রুমে ফোন দিল। কিন্তু ফোনের শব্দে কি আমার ঘুম ভাঙ্গবে? সাড়া না পেয়ে দরজা ভাঙ্গতে আসে। আমি ঘুম থেকে উঠে তার সাথে বের হলাম। ঢাকা শহর দেখতে।
লক্ষ লক্ষ মানুষ ঢাকার রাস্তায়। ইয়ুজু ছবি তোলে আর আমি আমাদের বিশেষ ধরনের তৈরি নবাবী রিকশায় ঘুমাই।
দুপুর ১২টার দিকে আমার আপার বাসায় গেলাম মিশন শাড়ী পড়া বাস্তবায়ন করতে। আপা বাসায় আমি ঘুমাই আমার ভাগ্নি, আপা সবাই মিলে তাকে শাড়ি পড়িয়ে দিল। দুপুরের মাঝামাঝি বের হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা দেখতে। নীলক্ষেত্রে এলাকা থেকে রিকশা প্রবেশ নিষেধ। আমরা হাটছি গন্তব্য টিএসসি হয়ে শাহবাগ।
টিএসসি থেকে শাহবাগ যাওয়া আগেই ইয়ুজু মহা বিরক্ত সে আর যাবে না। কারণ কারা যেন তার পেটে পিঠে চিমটি কাটছে বার বার। আমিও ভীড়ের মধ্যে না যাওয়ার পরামশ দিলাম। মহা বিরক্ত হয়ে আমরা রোকেয়া হল পার হয়ে ভিসি চত্ত্বরের দিকে হাটছি।
এদিকে রাস্তা কিছুটা ফাঁকা। চিমটি কাটার ভয় নেই। ইয়ুজু একটু হেটেই মিনিটের জন্য দাড়ায়। শিশুদের ছবি তুলে।
আমি সামনে সামনে হাঁটি একটু পর পর তার জন্য দাড়াই। কিছুক্ষণ পর দেখি মানুষজন সব আমার দিকে কেমন ভাবে তাকায় । ভাল লক্ষ্য করে দেখি ইয়ুজু তার শাড়ি খুলে হাতে নিয়ে হাটছে, শুধু ব্লাউজ আর পেটিকোট পড়ে। ভয়ানক দৃশ্য। ইয়ুজু স্বাভাবিক ভাবে মানুষের ছবি তুলছে। আমি ইয়ুজুকে তাড়াতাড়ি বুঝালাম যে সে এই ভাবে শাড়ি ছাড়া ঘুরতে পারে না।
শাড়িটিকে চাদরে মত তার শরীরে পেচিয়ে বাসার দিকে রওনা হলাম। লক্ষ্য করে দেখি তার ফসা পিঠে,পেটে অসংখ্য চিমটির দাগ।
রাস্তা সব মানুষজন আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। কয়েকজন মহিলা পুলিশের সহযোগিতায় তাকে কিছুটা শাড়ি পড়িযে। বাসার দিকে রওনা হলাম।
যদি এইরকম হয় তাহলে মেয়েরা কি করে উৎসবে যোগ দিবে? তারা উৎসব করতে জানে না। তাদের উৎসব করা শিখাতে হবে। তুমি পুলিশকে ঘটনাটা বলো। কয়েকজন পুশিলসহ বলল এত বড় উৎসবে এই রকম কিছু হবেই। ছেলেরা একটু মজা করবেই।
আমার সাথে ইয়ুজুর যোগাযোগ নেই। বহুবছর হয়ে গেল। কিন্তু বছর বৈশাখ এলে মনে হয়।
আমি মনে প্রাণে বলি ইয়ুজু আমরা ক্ষমাপ্রাথী। আমরা সত্যি উৎসব করতে জানি না।
Tuesday, April 7, 2015
ঢাকা বসবাসের অযোগ্য শহর। ঢাকায় নেই, নেই আর নেই। শত অভিযোগ ঢাকা নিয়ে ।
ঢাকা বসবাসের অযোগ্য শহর। ঢাকায় নেই, নেই আর নেই। শত অভিযোগ ঢাকা নিয়ে
। কত জ্ঞানী/গুণী মানুষের পিএইচডি,টকশো,আলোচনা, সভা,সেমিনার,মিটিং, মিছিল
ঢাকার সমস্যা ঘিরে। সবাই বাস অযোগ্য ঢাকার পিছনে অন্য কাউকে খুজতে ব্যস্ত।
কিন্তু বাস অযোগ্য ঢাকার তৈরির পিছনে নিজের চেহারা খুঁজে পাই না।শুধু অন্যের উপর দোষ চাপিয়ে দেওয়া নয়। আমরা সামর্থ্য অনুসারে নিজেদের চারপাশ সবুজে রাঙ্গাতে ব্যস্ত পুরো বর্ষা জুড়ে। আসুন একটা গাছ, একটা বীজ কিংবা আপনার টবে বড় হয়ে যাওয়া গাছটা রাস্তার পাশে ফাঁকা জায়গায় অথবা সড়ক বিভাজনে লাগিয়ে দেই। কারণ সবার দাবী ঢাকা বাসযোগ্য হোক।
শুধু অভিযোগে আর কাদা ছুড়াছুড়িতে ঢাকা এ অবস্থা পাল্টাবে না। আর অভিযোগ নয়। নিজেরা চেষ্টা করি । কারণ ঢা
কা বাস অযোগ্য হয়, আমাদের কারণে। আর ঢাকা সবুজ হবে যদি আপনি/আমি চাই।
আপনার লাগানো গাছে কে ফল খাবে, কিংবা গাছ থাকবে কিনা এই চিন্তা বাদ দিন। বরং গাছ লাগানোর সময় দেশীয় ফলজ,বনজ এবং ঔষধি গাছকে প্রাধান্য দিন। ফল,ফুল না পান। বিশুদ্ধ অক্সিজেন তো পাবেন-ই।
থানকুনি, পুদিনা, মেহেদি,পেঁপে, তুলসী,পাথরকুচি গাছগুলো আমার সড়ক বিভাজনে লাগাছি। আপনার এলাকায় কবে গাছ লাগাবেন? আপনি ডাকলেই আমি/আমরা হাজির হব।
Monday, April 6, 2015
অক্সিজেনের কারখানা বানাই।
![]() |
| অক্সিজেনের কারখানা বানাই। |
এবার আমারও দায় শোধ করার প্রয়োজন। পুরো শহরটাই আমার। তাই আমার শহরে মাটি পেলেই গাছ লাগাই। অক্সিজেনের কারখানা বানাই।
Friday, March 20, 2015
স্বাস্থ্যসম্মত ভাবে খাবার কি করে রঙ্গিন করবেন।
![]() |
| অপরাজিতা ফুল ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে নীল নুডলস |
আজকের বিষয় কিভাবে খাবার রঙ্গিন করবেন। আজ খাবার নীল কিংবা আকাশী রং তৈরি কৌশল জানাব।
খাবারে কৃত্রিম রং ব্যবহারে কিডনি, হৃদপিন্ড, অস্থিমজ্জাসহ সমগ্র দেহযন্ত্রের ক্ষতি হয়। এটা সবাই জানেন। তারপরও রঙ্গিন খাবারের প্রতি কিছুটা আকর্ষণ থাকেই। আর এই আকর্ষনের কারণে বিষাক্তটেক্সটাইল কালারগুলো আমাদের বাসা ও হোটেলগুলোর রান্না ঘরে স্থান করে নিয়ে। তাছাড়া বাজারে যতই ফুড গ্রেড কালার স্বাস্থ্যকর বলা হোক না কেন তা স্বাস্থ্যকর নয়। খাদ্য ও পানীয়ে ব্যবহৃত কৃত্রিম রংগুলো বিভিন্নভাবে স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে।
![]() |
| অপরাজিতা ফুলের রং ব্যবহার করে নীল জর্দা,আমি ভাবছি রান্না নিয়ে একটা বই লিখব। তার প্রাথমিক চেষ্টা। |
তবে ক্ষতি কি যদি নিজেই তৈরি করা যায খাবারে ব্যবহারের রং। নিজের তৈরি রঙে খাবার রাঙিয়ে পরিবেশন করুন পরিজনের মাঝে।
পোলাও শুধু সাদা হবে তা নয়, চাইলে আপনি একটু নীলের ছোঁয়া দিতে পারেন । তেমনি ভাবে ভাত,জর্দা, নুডলসসহ বিভিন্ন খাবারে নীল কিংবা আকাশী রংয়ের ছোঁয়া আনতে পারেন। অপরাজিতা ফুল ব্যবহার করে।
বাসার টবে একটা অপরাজিতার বীজ বুনে দিন। তারপর মাসখানিকের মধ্যে ফুল পাবেন। ফুলগুলো একটু কাঁচা থাকা অবস্থায় সংগ্রহ করে রোদে শুকিয়ে নিন। এবার একটি সচ্ছ কাপ বা গ্লাসে একটু গরম পানি নিন এবং শুকনো অপরাজিতা ভিজিয়ে রাখুন। হয়ে গেল স্বাস্থ্যকর খাবার যোগ্য নীল রং । এবার পরিমাণ মত রং মিশিয়ে নীল/আকাশী জর্দা, নীল/আকাশী ভাত, নীল/আকাশী নুডলস, নীল সরবত তৈরি করতে পারেন।
![]() |
| এটি বিখ্যাত অপরাজিতা ফুল |
চোখের ক্ষুদা বলে একটা কথা আছে। যার পেট পূর্ণ থাকবে আশা করি সেও একটু চেখে দেখবে আপনার রান্না। যতই দূর্নাম থাকুক না কেন আপনার রান্না নিয়ে অপরাজিতা আপনাকে জয়ই করবেই।
আগামীতে খাবার রঙিন করার আরো কৌশল বিনামূল্যে শিখানো হবে।
Wednesday, October 15, 2014
শিশুদের জন্য মুরগীর আস্ত রান। ক্যামেরা আর ব্যান্ডিং নিষিদ্ধ
ভোর ৫টায় আমাদের রওনা হবার সময়
ঠিক করা হল। গন্তব্য আনন্দপুর। আনন্দপুর দুনিয়ার কোন প্রান্তের গ্রাম। সেই
গ্রামে কি আছে, কেন যাচ্ছি, তার কোন কারণ জানি না। গাড়িতে উঠেই আমি ঘুম
দিলাম। ঢাকা ময়মনসিংহের ভাঙ্গা রাস্তা পারি দিতে গিয়ে। আনন্দপুরে যাওয়া
নিয়ে আমার আনন্দ শেষ হয়ে গেছে। তারপরও আমি ঘুমাচ্ছি। ময়মনসিংহের মানুষের
সময় জ্ঞানের জন্য বিখ্যাত। কারণ তারা যদি বলে এক ঘন্টার রাস্তা । তবে আপনি
নিশ্চিত ‘ ঘন্টা তিনের রাস্তা পারি দিতে হবে। আমি একপ্রকার ঘুমিয়ে
ময়মনসিংহে পৌঁছি। তারপর রানা ভাই বললেন নাস্তা করে নিতে হবে। কারণ সামনে
খাওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই। নাস্তা সেরে শহর থেকে মিনিট ৪০ গাড়ি চলার পর।
গাড়িটি গ্রামের মাটির রাস্তায় নেমে পড়ে। যে বাড়ির উঠানে আমাদের গাড়ি
থামানো হয়েছে, সেই বাড়ি ভর্তি শিশু। রানা ভাই ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে শিশুদের
সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। এর নাম আসাদুল, এর নাম মানিক মিয়া, এর নাম
.......................।
একটু পর খাওয়া দাওয়া শুরু হবে। সবাই খাবারের আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত। অনেক কিছু রান্না করা হয়েছে। আমরা স্থানীয় মানুষজনের সাথে গল্প করছি। হুট করে দেখি রানা ভাই বিষ্ফোরণ। খুবই রাগারাগি করছেন। কয়েকজনের সাথে। রাগের কারণ, কেন একটি মুরগী কম জবাই করা হল। ঘোষনা করা হল খাবার দিতে দেরি হবে। কারণ মুরগী জবাই করা হবে, তারপর আবার রান্না হবে। তারপর খাওয়া শুরু।
আমি রাধুনীর সাথে গল্প করছি। এই মহিলার হাত স্বর্ণ দিয়ে বাধাই করা উচিত বলে শুনেছি। রাধুনীর কাছে তার রান্নার রহস্য কি জানতে চাইলাম। সে শুধুই হাসে। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম রানা ভাই কেন বকা দিলেন? বাইচ্চা একটা বাইরা গেছে। ১৪জনের জন্য ৭টা মুরগী জবাই করছিলাম। সকালে আর একটা বাইচা আইল। মোট ১৫টা বাইচা। আমি মনে করলাম। ১৪টারে একটা কইরা রান দিমু। আর একটারে সিনার বড় টুকরা দিমু। কিন্তু মামায় মানে না। কয় ক্যান ১৫টা রান রান্না করি নাই। যাই হোক মুরগীর রান রান্না হচ্ছে।
এই গ্রামের সকল দরিদ্র এতিম শিশুর জন্য আজ মুরগীর আস্ত রান রান্না করা হয়েছে। আমি ভয়ানক ক্ষুদা নিয়ে বসে আছি। শিশু ছাড়া এই খাবার আয়োজনে অন্য কারো অংশগ্রহনের সুযোগ নেই। কিছুক্ষনের মধ্যে খাবার বিতরণ শুরু হল। প্লেইট ভর্তি ভাত আর আস্ত মুরগীর রান। শিশুরা মুরগীর রান খাচ্ছে। চোখের পানি, নাকের পানিতে মুরগীর রানের মিশে একাকার। কেউ কেউ রান নিয়ে বসে আছে। এখন খাবে না মুরগীর রান বাড়িতে নিয়ে খাবে।
আমি রানা ভাইয়ের পাশে বসে শিশুদের রানা খাওয়া দেখছি। এই শিশুদের অনেকের জীবনের আজ প্রথম রান খাচ্ছে। কারণ তাদের কারো মা,বাবা নেই। দাদা- দাদী কিংবা কারো তাও আশ্রয় নেই। রক্ত সম্পর্কহীন গ্রামের কারো আশ্রয়ে বেঁচে আছে। এই শিশুদের কপালে যদি কখন মুরগীর মাংস জুটে কিন্তু কোনদিন মুরগীর রান জুটে না। রানা ভাই তাদের জন্য রান খাওয়ার প্রোগ্রাম চালু করেছেন।
জীবনে বহুবার মুরগীর রান খেয়েছি। কিন্তু আমার আজ মুরগীর রানের প্রতি লোভ সামলাতে পারছি না। কিন্তু রানা ভাইয়ের কঠোর নিষেধ শিশুদের খাওয়ানোর আগে পরে কেউ খাবার খেতে পারবে না। আমি রানা ভাইয়ের কাজ কর্মে কোন যুক্তি তর্কে যাই না। আমি আমার জি১২ ক্যামেরা বের করে প্রস্তুতি নিলাম ছবি তোলার। এই মূহুর্তগুলো যদি ক্যামেরা বন্দী না করি তবে না-ই হবে। কতগুলোর শিশু হাসি মুখ ছবি। প্লেইট ভর্তি মুরগীর আস্ত রান। আমি একটা ছবি তোলেছি। রানা ভাই এসে জানিয়ে দিলেন ছবি তোলা যাবে না। আমি বললাম কেন। কাউকে খাবার খাইয়ে তার প্রতিদান চাও মানে ব্যবসা। এটা ব্যবসা নয়। আমি যুক্তি দিলাম রানা ভাই ব্যবসার কথা কেন বলছেন। এই ছবি দেখে অনেক তরুন-তরুনী এগিয়ে আসবে। নাহ শিশুরা খাবার খাচ্ছে এই ছবি প্রচার করার অধিকার আমার নেই। এই ছবি দিয়ে আমি কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই না। এই ছবি আমি নিজে দেখতে চাই। প্রয়োজনে আপনি নিজেও জীবন্ত এই ছবি তৈরি করতে পারেন।
আমি বললাম ঠিক আছে আপনি যখন আগামীতে এই রকম আয়োজন করবেন আমি ঢাকা থেকে প্রচুর সেচ্ছাসেবক নিযে আসব।
তিনি সরাসরি প্রতিবাদ করলেন। নাহ আমি গ্রামে এই শিশুদের খাবারের আয়োজন করেছি। শহুরের একদল তরুণ তরুনী দয়া-মায়া মাখানো মুখ নিয়ে শিশুদের খাবার খাওয়াছে। আমি এই রকম একটা নষ্ট বিষয় কল্পনাও করতে চাই না। শিশুগুলোর সারা জীবন ভাববে তারা শহরের ধনী মানুষের দয়াতে মুরগীর রান খেয়েছে। আর শহরের তরুণগুলোর ধারনা হবে তারা গ্রামের গরীবদের খাওয়াতে পারে। দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হবে। প্রয়োজনে তোমরা ঢাকায় আয়োজন কর। কি দরকার ঢাকা থেকে হাজার টাকা খরচ করে এই গ্রামে আসার। বরং যাতায়াতের টাকা দিয়ে আরো বেশি শিশুদের রান খাওয়ানো যাবে।
যাই হোক ভাই আমার খিদা লেগেছে খেয়ে নি। নাহ এখানে খাওয়া যাবে না। কারণ আমি এবং আমার আত্মীয়রা এই খাবারের জন্য আমাকে টাকা দিয়েছে তা শুধুমাত্র এতিম শিশুদের জন্য। এই খাবারে অন্য কারো হক থাকতে পারে না। আমরা যাওয়ার পথে ময়মনসিংহ শহরে খাব।
ঝড়, গাড়ি নষ্ট নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে আমরা অনেক রাতে ঢাকায় ফিরলাম। আমার চোখের সামনে ভেসে বেড়াছে একদল শিশুর মুরগীর রান খাওয়ার ছবি। এক বৃদ্ধার জীবনে প্রথম নাতির মুখে মুরগীর আস্ত রান তুলে দেওয়ার সুখের কান্না। এই ছবিগুলো আমার কাছে সারাজীবনের জন্য জীবন্ত।
প্রিয় রানা ভাই
আপনি জেনে আনন্দিত একদল তরুন আগামী ১৮ তারিখ ঢাকা শহরের প্রায় ৩০০ শিশুর জন্য খাবারের আয়োজন করেছে। শিশুদের এই আয়োজনে তারা সকল প্রকার ব্যান্ডিং ও ক্যামেরার ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। আমি বিশ্বাস এই তরুনরা ক্যামেরা আর ব্যান্ডিং নিষিদ্ধ করে এই নগরে সেচ্ছাসেবার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে যাচ্ছে।
একটু পর খাওয়া দাওয়া শুরু হবে। সবাই খাবারের আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত। অনেক কিছু রান্না করা হয়েছে। আমরা স্থানীয় মানুষজনের সাথে গল্প করছি। হুট করে দেখি রানা ভাই বিষ্ফোরণ। খুবই রাগারাগি করছেন। কয়েকজনের সাথে। রাগের কারণ, কেন একটি মুরগী কম জবাই করা হল। ঘোষনা করা হল খাবার দিতে দেরি হবে। কারণ মুরগী জবাই করা হবে, তারপর আবার রান্না হবে। তারপর খাওয়া শুরু।
আমি রাধুনীর সাথে গল্প করছি। এই মহিলার হাত স্বর্ণ দিয়ে বাধাই করা উচিত বলে শুনেছি। রাধুনীর কাছে তার রান্নার রহস্য কি জানতে চাইলাম। সে শুধুই হাসে। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম রানা ভাই কেন বকা দিলেন? বাইচ্চা একটা বাইরা গেছে। ১৪জনের জন্য ৭টা মুরগী জবাই করছিলাম। সকালে আর একটা বাইচা আইল। মোট ১৫টা বাইচা। আমি মনে করলাম। ১৪টারে একটা কইরা রান দিমু। আর একটারে সিনার বড় টুকরা দিমু। কিন্তু মামায় মানে না। কয় ক্যান ১৫টা রান রান্না করি নাই। যাই হোক মুরগীর রান রান্না হচ্ছে।
এই গ্রামের সকল দরিদ্র এতিম শিশুর জন্য আজ মুরগীর আস্ত রান রান্না করা হয়েছে। আমি ভয়ানক ক্ষুদা নিয়ে বসে আছি। শিশু ছাড়া এই খাবার আয়োজনে অন্য কারো অংশগ্রহনের সুযোগ নেই। কিছুক্ষনের মধ্যে খাবার বিতরণ শুরু হল। প্লেইট ভর্তি ভাত আর আস্ত মুরগীর রান। শিশুরা মুরগীর রান খাচ্ছে। চোখের পানি, নাকের পানিতে মুরগীর রানের মিশে একাকার। কেউ কেউ রান নিয়ে বসে আছে। এখন খাবে না মুরগীর রান বাড়িতে নিয়ে খাবে।
আমি রানা ভাইয়ের পাশে বসে শিশুদের রানা খাওয়া দেখছি। এই শিশুদের অনেকের জীবনের আজ প্রথম রান খাচ্ছে। কারণ তাদের কারো মা,বাবা নেই। দাদা- দাদী কিংবা কারো তাও আশ্রয় নেই। রক্ত সম্পর্কহীন গ্রামের কারো আশ্রয়ে বেঁচে আছে। এই শিশুদের কপালে যদি কখন মুরগীর মাংস জুটে কিন্তু কোনদিন মুরগীর রান জুটে না। রানা ভাই তাদের জন্য রান খাওয়ার প্রোগ্রাম চালু করেছেন।
জীবনে বহুবার মুরগীর রান খেয়েছি। কিন্তু আমার আজ মুরগীর রানের প্রতি লোভ সামলাতে পারছি না। কিন্তু রানা ভাইয়ের কঠোর নিষেধ শিশুদের খাওয়ানোর আগে পরে কেউ খাবার খেতে পারবে না। আমি রানা ভাইয়ের কাজ কর্মে কোন যুক্তি তর্কে যাই না। আমি আমার জি১২ ক্যামেরা বের করে প্রস্তুতি নিলাম ছবি তোলার। এই মূহুর্তগুলো যদি ক্যামেরা বন্দী না করি তবে না-ই হবে। কতগুলোর শিশু হাসি মুখ ছবি। প্লেইট ভর্তি মুরগীর আস্ত রান। আমি একটা ছবি তোলেছি। রানা ভাই এসে জানিয়ে দিলেন ছবি তোলা যাবে না। আমি বললাম কেন। কাউকে খাবার খাইয়ে তার প্রতিদান চাও মানে ব্যবসা। এটা ব্যবসা নয়। আমি যুক্তি দিলাম রানা ভাই ব্যবসার কথা কেন বলছেন। এই ছবি দেখে অনেক তরুন-তরুনী এগিয়ে আসবে। নাহ শিশুরা খাবার খাচ্ছে এই ছবি প্রচার করার অধিকার আমার নেই। এই ছবি দিয়ে আমি কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই না। এই ছবি আমি নিজে দেখতে চাই। প্রয়োজনে আপনি নিজেও জীবন্ত এই ছবি তৈরি করতে পারেন।
আমি বললাম ঠিক আছে আপনি যখন আগামীতে এই রকম আয়োজন করবেন আমি ঢাকা থেকে প্রচুর সেচ্ছাসেবক নিযে আসব।
তিনি সরাসরি প্রতিবাদ করলেন। নাহ আমি গ্রামে এই শিশুদের খাবারের আয়োজন করেছি। শহুরের একদল তরুণ তরুনী দয়া-মায়া মাখানো মুখ নিয়ে শিশুদের খাবার খাওয়াছে। আমি এই রকম একটা নষ্ট বিষয় কল্পনাও করতে চাই না। শিশুগুলোর সারা জীবন ভাববে তারা শহরের ধনী মানুষের দয়াতে মুরগীর রান খেয়েছে। আর শহরের তরুণগুলোর ধারনা হবে তারা গ্রামের গরীবদের খাওয়াতে পারে। দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হবে। প্রয়োজনে তোমরা ঢাকায় আয়োজন কর। কি দরকার ঢাকা থেকে হাজার টাকা খরচ করে এই গ্রামে আসার। বরং যাতায়াতের টাকা দিয়ে আরো বেশি শিশুদের রান খাওয়ানো যাবে।
যাই হোক ভাই আমার খিদা লেগেছে খেয়ে নি। নাহ এখানে খাওয়া যাবে না। কারণ আমি এবং আমার আত্মীয়রা এই খাবারের জন্য আমাকে টাকা দিয়েছে তা শুধুমাত্র এতিম শিশুদের জন্য। এই খাবারে অন্য কারো হক থাকতে পারে না। আমরা যাওয়ার পথে ময়মনসিংহ শহরে খাব।
ঝড়, গাড়ি নষ্ট নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে আমরা অনেক রাতে ঢাকায় ফিরলাম। আমার চোখের সামনে ভেসে বেড়াছে একদল শিশুর মুরগীর রান খাওয়ার ছবি। এক বৃদ্ধার জীবনে প্রথম নাতির মুখে মুরগীর আস্ত রান তুলে দেওয়ার সুখের কান্না। এই ছবিগুলো আমার কাছে সারাজীবনের জন্য জীবন্ত।
প্রিয় রানা ভাই
আপনি জেনে আনন্দিত একদল তরুন আগামী ১৮ তারিখ ঢাকা শহরের প্রায় ৩০০ শিশুর জন্য খাবারের আয়োজন করেছে। শিশুদের এই আয়োজনে তারা সকল প্রকার ব্যান্ডিং ও ক্যামেরার ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। আমি বিশ্বাস এই তরুনরা ক্যামেরা আর ব্যান্ডিং নিষিদ্ধ করে এই নগরে সেচ্ছাসেবার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে যাচ্ছে।
Monday, October 6, 2014
বুড়িগঙ্গার অন্য রূপ।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর ছিল নদী দিবস। এই দিনে নদীকে ভালোবাসে এমন
দুনিয়াব্যাপী কোটি মানুষ নদীর পক্ষে লড়াই করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় মনে
প্রাণে। নদীর প্রতি ভালোবাসার এই দিবসে কয়েকজন নদী প্রেমিকের সাথে
গিয়েছিলাম বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষা রাজধানীর একমাত্র জেলেপল্লীতে।
বুড়িগঙ্গায় অক্সিজেনের মাত্রা কত? বিষাক্ত গ্যাস কোনটা কত আছে? কোথায় কী দূষণ হচ্ছে? নদী নিয়ে দুর্নীতি হাজারো সংবাদ পড়ি এই নদীটাকে নিয়ে। কিন্তু বুড়িগঙ্গার আরো অনেক রূপ আছে। কাশফুল, বক, মাছরাঙ্গা, পাল তোলা নৌকা, জেলে, মাঝি, নদীকে ঘিরে কতোসব উৎসব যে এখনো টিকে আছে তা অজানাই রয়ে গেল! আজ জানাবো নদীর অন্যরূপ। অন্য একদল মানুষের কথা যারা এখনো এই নদীনির্ভর। তাদের জীবন জীবিকা এই নদীকে ঘিরে। প্রতিনিয়ত সংগ্রামের পাশাপাশি তারা স্বপ্ন দেখে আবারও এই নদীটায় বর্ষায় রুই, কাতলা, বোয়াল, পুঁটি ধরা পড়বে ঝাঁকে ঝাঁকে। শীতকালে বাড়া/ঝাপ (গাছের ডাল-পালা দিয়ে নদীতে মাছ ধরার ফাঁদ) থেকে আবারও শিং, মাগুর, কৈ, বাইম ধরা পড়বে। এখনো বর্ষায় এই নদী যাদের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম উৎস। বুড়িগঙ্গার জলেই যাদের ঘর-সংসারের অধিকাংশ কাজ চলে। সেই মানুষদের গল্প দেখতে আর শুনতে বুড়িগঙ্গা রিভার কিপার শরীফ জামিল ভাই নদী দিবসে আয়োজন করেন জেলেদের সাথে আড্ডা। বুড়িগঙ্গার পাড়ে জেলেদের জেলে পেশায় টিকে থাকার গল্প শুনে আপনিও অবাক হবেন। এত দূষিত নদীতে কি মাছ থাকে? এই শহরে এখনো কী করে শত বছরের জেলে পাড়ার লোকগুলো তাদের পেশায় টিকে আছে? গ্রামের তরুণরা তাদের প্রবীণদের কাছ থেকে এই নদীর অনেক গল্প শুনেছে। কে কত বড় মাছ ধরেছে এই নদী থেকে? জেলেপাড়ার মানিক রাজবংশী গর্বের সাথে বলেন, এক যুগ আগেও মাছে ভরে যেত নৌকা। তিনি জানালেন, বছর কয়েক আগেও এই পল্লীতে অসংখ্য জেলে-জাল-নৌকা ছিল। মানুষগুলোর মাছ ধরা-কেনা-বেচাই ছিল প্রধান পেশা। বেপারিরা অগ্রিম টাকা দিয়ে যেত। ফরিদপুর, পাবনা থেকে লোক আসত এই পল্লীতে রোজ কামলা খাটতে। গেল বছর শেষবারের মতো এসেছিল লোক। এই বছর আসে নদীতে মাছ নেই। তাছাড়া সারা রাত খেটে পাওয়া যায় জন প্রতি পঞ্চাশ থেকে দুইশ টাকা।
এখন ডিপজল, সোয়ারি ঘাট, কাওরান বাজার, নিউমার্কেট থেকে পাইকারি বাজার থেকে মাছ কিনে রায়েরবাজারে বিক্রি করে। অনেকে ভিটে-বাড়ি বিক্রি করে কলকাতায় চলে গেছে। যারা গেছে তাদের তালিকায় নিজের পরিবারের লোকও আছে। কিন্তু তিনি যেতে পারেননি। বলতে থাকেন মানিক রাজবংশী।
বাপ-দাদা চৌদ্দ পুরুষের ভিটা। শুধু যে ভিটার টানে থাকি তা নয়। নদীর প্রতি একটা টান পরে গেছে কয়েকবার যেতেও চেয়েছি। মন সায় দেয় না। শান্তি পাই না। কেমন জানি মনে হয় নদীতে আবারও মাছ পড়বে। আমি নৌকা, জাল সব বিক্রি করে দিয়েছি বেপারির দেনা শোধ দিতে। তবে মাছ পড়লেই আবার জাল নিব। মাছ কিনে বিক্রি করে সুখ নাই। মাছ ধরে বিক্রি করাতে আলাদা আনন্দ আছে। এক নিঃশ্বাসে বলে যান আশাবাদী রাজবংশী।
সন্ধ্যায় নদীতে দেখা হলো সুবল রাজবংশীর সাথে। তিনি এখনো প্রতিরাতে মাছ ধরতে যান নদীতে। তার মতো আরো সাতটি নৌকা টিকে আছে এই জেলেপাড়ায়। সন্ধ্যার পর তারা আটজনের দল যান নদীতে। সারা রাত মাছ ধরে সকালে বেপারিরা মাছ বিক্রি করে রায়ের বাজারে। মাছের পরিমাণ এখন খুবই কম তবুও বাপ দাদার পেশাটা আঁকড়ে ধরে আছেন।
সারা বিকেল জেলেদের সাথে আড্ডার পাশাপাশি উপভোগ করলাম বুড়িগঙ্গার অন্য রূপ। বর্ষায় কিন্তু জেলেপাড়াটা পুরো ভিন্ন রূপ ধারণ করে। নদীর তীর ঘেঁষে কাশ ফুল। সারি সারি মাছ ধরার নৌকা, তীরে ছড়ানো মাছ ধরার জাল, স্বচ্ছ পানি- কী নেই এই নদীতে? এই সবই এখনো অল্প পরিসরে হলেও দেখা যাবে বুড়িগঙ্গার তীরের জেলেপাড়াতে। বর্ষার এই স্বচ্ছ জলে শুধু পাওয়া যাবে না মাছ। কিন্তু মাছ ধরাই যাদের চৌদ্দপুরুষের পেশা, নেশা। তাদের জন্য নদীর অর্থ অনেক। নদী তাদের কাছে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, জীবন-জীবিকা, উৎসব আরো কত কী! তাই তো সুবলের কণ্ঠে কলকলিয়ে বেরিয়ে আসে- যতই কাল হোক নদীর জল এই নদীকে ঘৃণা করি কী করে? এখনো তো তার কৃপায় বেঁচে আছি।
সন্ধ্যার পর পর আমরা চলে আসছি মেঠো পথ ধরে, উদ্দেশ্য বছিলার প্রধান সড়ক থেকে গাড়িতে উঠবো। জেলেপাড়ার নারী-পুরুষ, বাচ্চারা গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেল। গাড়িতে উঠার আগ মুহূর্তে এক বয়স্ক লোক শরীফ ভাইয়ের হাত চেপে ধরলো। ‘বাপ নদীটারে আগের মতো করে দাও। মরার আগে আমি নদীটারে আগের মতো দেখতে চাই’- নদীর জন্য মানুষটা কাঁদছে। এই জেলের চোখের জল শুধু কি নদীর জন্য? নাকি নদীকেন্দ্রিক তার ভালোবাসা, যে ভালবাসার জন্য সবাই চলে যাওয়ার পরও বৃদ্ধ ভিটে বাড়ি বিক্রি করে যাননি।
বুড়িগঙ্গাকে ঘিরে জেলে পল্লীর এই পরিবারগুলো সুখ-দুঃখের কথা কখনো কোনো নীতি নির্ধারণী সভা সমাবেশে আলোচিত হবে না। কিন্তু আমরা যারা নদী নিয়ে কথা বলি, পরিকল্পনা করি, নদীকে ভালোবাসি তাদের কাছে অনুরোধ, একবার এই বর্ষার সময় করে ঘুরে আসুন বছিলার জেলে পল্লী থেকে। নদীকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকা এই মানুষগুলোর কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পাবেন। ভালোবাসতে পারবেন নদীকে, লড়তে পারবেন নদীর জন্য আরো শক্ত করে।
বুড়িগঙ্গায় অক্সিজেনের মাত্রা কত? বিষাক্ত গ্যাস কোনটা কত আছে? কোথায় কী দূষণ হচ্ছে? নদী নিয়ে দুর্নীতি হাজারো সংবাদ পড়ি এই নদীটাকে নিয়ে। কিন্তু বুড়িগঙ্গার আরো অনেক রূপ আছে। কাশফুল, বক, মাছরাঙ্গা, পাল তোলা নৌকা, জেলে, মাঝি, নদীকে ঘিরে কতোসব উৎসব যে এখনো টিকে আছে তা অজানাই রয়ে গেল! আজ জানাবো নদীর অন্যরূপ। অন্য একদল মানুষের কথা যারা এখনো এই নদীনির্ভর। তাদের জীবন জীবিকা এই নদীকে ঘিরে। প্রতিনিয়ত সংগ্রামের পাশাপাশি তারা স্বপ্ন দেখে আবারও এই নদীটায় বর্ষায় রুই, কাতলা, বোয়াল, পুঁটি ধরা পড়বে ঝাঁকে ঝাঁকে। শীতকালে বাড়া/ঝাপ (গাছের ডাল-পালা দিয়ে নদীতে মাছ ধরার ফাঁদ) থেকে আবারও শিং, মাগুর, কৈ, বাইম ধরা পড়বে। এখনো বর্ষায় এই নদী যাদের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম উৎস। বুড়িগঙ্গার জলেই যাদের ঘর-সংসারের অধিকাংশ কাজ চলে। সেই মানুষদের গল্প দেখতে আর শুনতে বুড়িগঙ্গা রিভার কিপার শরীফ জামিল ভাই নদী দিবসে আয়োজন করেন জেলেদের সাথে আড্ডা। বুড়িগঙ্গার পাড়ে জেলেদের জেলে পেশায় টিকে থাকার গল্প শুনে আপনিও অবাক হবেন। এত দূষিত নদীতে কি মাছ থাকে? এই শহরে এখনো কী করে শত বছরের জেলে পাড়ার লোকগুলো তাদের পেশায় টিকে আছে? গ্রামের তরুণরা তাদের প্রবীণদের কাছ থেকে এই নদীর অনেক গল্প শুনেছে। কে কত বড় মাছ ধরেছে এই নদী থেকে? জেলেপাড়ার মানিক রাজবংশী গর্বের সাথে বলেন, এক যুগ আগেও মাছে ভরে যেত নৌকা। তিনি জানালেন, বছর কয়েক আগেও এই পল্লীতে অসংখ্য জেলে-জাল-নৌকা ছিল। মানুষগুলোর মাছ ধরা-কেনা-বেচাই ছিল প্রধান পেশা। বেপারিরা অগ্রিম টাকা দিয়ে যেত। ফরিদপুর, পাবনা থেকে লোক আসত এই পল্লীতে রোজ কামলা খাটতে। গেল বছর শেষবারের মতো এসেছিল লোক। এই বছর আসে নদীতে মাছ নেই। তাছাড়া সারা রাত খেটে পাওয়া যায় জন প্রতি পঞ্চাশ থেকে দুইশ টাকা।
এখন ডিপজল, সোয়ারি ঘাট, কাওরান বাজার, নিউমার্কেট থেকে পাইকারি বাজার থেকে মাছ কিনে রায়েরবাজারে বিক্রি করে। অনেকে ভিটে-বাড়ি বিক্রি করে কলকাতায় চলে গেছে। যারা গেছে তাদের তালিকায় নিজের পরিবারের লোকও আছে। কিন্তু তিনি যেতে পারেননি। বলতে থাকেন মানিক রাজবংশী।
বাপ-দাদা চৌদ্দ পুরুষের ভিটা। শুধু যে ভিটার টানে থাকি তা নয়। নদীর প্রতি একটা টান পরে গেছে কয়েকবার যেতেও চেয়েছি। মন সায় দেয় না। শান্তি পাই না। কেমন জানি মনে হয় নদীতে আবারও মাছ পড়বে। আমি নৌকা, জাল সব বিক্রি করে দিয়েছি বেপারির দেনা শোধ দিতে। তবে মাছ পড়লেই আবার জাল নিব। মাছ কিনে বিক্রি করে সুখ নাই। মাছ ধরে বিক্রি করাতে আলাদা আনন্দ আছে। এক নিঃশ্বাসে বলে যান আশাবাদী রাজবংশী।
সন্ধ্যায় নদীতে দেখা হলো সুবল রাজবংশীর সাথে। তিনি এখনো প্রতিরাতে মাছ ধরতে যান নদীতে। তার মতো আরো সাতটি নৌকা টিকে আছে এই জেলেপাড়ায়। সন্ধ্যার পর তারা আটজনের দল যান নদীতে। সারা রাত মাছ ধরে সকালে বেপারিরা মাছ বিক্রি করে রায়ের বাজারে। মাছের পরিমাণ এখন খুবই কম তবুও বাপ দাদার পেশাটা আঁকড়ে ধরে আছেন।
সারা বিকেল জেলেদের সাথে আড্ডার পাশাপাশি উপভোগ করলাম বুড়িগঙ্গার অন্য রূপ। বর্ষায় কিন্তু জেলেপাড়াটা পুরো ভিন্ন রূপ ধারণ করে। নদীর তীর ঘেঁষে কাশ ফুল। সারি সারি মাছ ধরার নৌকা, তীরে ছড়ানো মাছ ধরার জাল, স্বচ্ছ পানি- কী নেই এই নদীতে? এই সবই এখনো অল্প পরিসরে হলেও দেখা যাবে বুড়িগঙ্গার তীরের জেলেপাড়াতে। বর্ষার এই স্বচ্ছ জলে শুধু পাওয়া যাবে না মাছ। কিন্তু মাছ ধরাই যাদের চৌদ্দপুরুষের পেশা, নেশা। তাদের জন্য নদীর অর্থ অনেক। নদী তাদের কাছে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, জীবন-জীবিকা, উৎসব আরো কত কী! তাই তো সুবলের কণ্ঠে কলকলিয়ে বেরিয়ে আসে- যতই কাল হোক নদীর জল এই নদীকে ঘৃণা করি কী করে? এখনো তো তার কৃপায় বেঁচে আছি।
সন্ধ্যার পর পর আমরা চলে আসছি মেঠো পথ ধরে, উদ্দেশ্য বছিলার প্রধান সড়ক থেকে গাড়িতে উঠবো। জেলেপাড়ার নারী-পুরুষ, বাচ্চারা গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেল। গাড়িতে উঠার আগ মুহূর্তে এক বয়স্ক লোক শরীফ ভাইয়ের হাত চেপে ধরলো। ‘বাপ নদীটারে আগের মতো করে দাও। মরার আগে আমি নদীটারে আগের মতো দেখতে চাই’- নদীর জন্য মানুষটা কাঁদছে। এই জেলের চোখের জল শুধু কি নদীর জন্য? নাকি নদীকেন্দ্রিক তার ভালোবাসা, যে ভালবাসার জন্য সবাই চলে যাওয়ার পরও বৃদ্ধ ভিটে বাড়ি বিক্রি করে যাননি।
বুড়িগঙ্গাকে ঘিরে জেলে পল্লীর এই পরিবারগুলো সুখ-দুঃখের কথা কখনো কোনো নীতি নির্ধারণী সভা সমাবেশে আলোচিত হবে না। কিন্তু আমরা যারা নদী নিয়ে কথা বলি, পরিকল্পনা করি, নদীকে ভালোবাসি তাদের কাছে অনুরোধ, একবার এই বর্ষার সময় করে ঘুরে আসুন বছিলার জেলে পল্লী থেকে। নদীকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকা এই মানুষগুলোর কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পাবেন। ভালোবাসতে পারবেন নদীকে, লড়তে পারবেন নদীর জন্য আরো শক্ত করে।
Subscribe to:
Posts (Atom)







